প্রিয় স্যার,
আপনাকে এই
সম্বোধনে ডাকা উচিত হবে কি না,এই দ্বিধা মেনে নিয়েই এই লেখা শুরু করছি। আপনি প্রিয়,এটা নিয়ে যদিও কোনো সন্দেহ নেই। আর জীবনে কোন ব্যক্তিদেরকে ‘স্যার’ ডাকা হয় তা কে না
জানেন? এমন মনীষীরাই তো
আমাদের লেখাপড়া শিখান,বোধ,বোধের মূল্য,এবং এসবের মিশেলে তৈরি আমাদের আজকের মূল্যবোধ সৃষ্টি করে
দেন। আপনি যদিও কোনোকালে আমার শিক্ষক ছিলেন না,তবু আমার মতো
এমন অনেক ছাপোষা,দৈনন্দিন বেঁচে থাকা প্রাণীরাও আপনাকে স্যার বলে
ডাকছেন সব সময়। আসলে এমন কিছু মনীষী সবার জীবনেই থাকে,যারা আমাদের অজান্তেই স্যার,পথ প্রদর্শক,নীতি নির্ধারক
বা গুরু হয়ে যান।
তবে,কবে থেকে আপনি আমার স্যার হলেন তা বলতে পারবো না। বলতে
পারবো না,প্রথম কোন বইটা পড়েছিলাম,কোন বইতে প্রথম আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে আপনার লেখার প্রেমে
পড়েছিলাম। হিমু,মিসির আলী,বাকের ভাই,মামা,ছোট মির্জা,সাদেক আলী ছাড়া আর কয়টা চরিত্রের কথাই বা আমি বলতে পারি? আপনার যে বইটা পড়ার পর আপনার লেখা পড়া ছেড়ে দিয়েছিলাম
সে বইটা-‘মেঘ বলেছে যাব যাব’র হাসান কে মনে আছে। সেটা ১৬ বছর আগের কথা।
আপনার অন্তর্ধানের কিছুদিন আগে ‘জোছনা ও জননীর
গল্প’ পড়ার ইচ্ছা হলো।
দীর্ঘ ১৬ বছর পরে আবার আপনার লেখা পড়লাম। এই দীর্ঘ বিরতির কারন একটাই। আপনার বইগুলি
সব একই রকম একঘেয়ে, একই ধাঁচের বলে মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল আপনি
নিজেকে ছাড়িয়ে যাবার চেষ্টা না করে,নতুন কিছু
কিছু সৃষ্টি না করে পাঠক যা গিলতে চাচ্ছে সেটাকেই পুনরুৎপাদন করে চলেছেন। তারপরও
ছেড়া ছেড়া কিছু দৃশ্যকল্প মনে পড়ে। আশাবরী’র জ্বরে আক্রান্ত সেই ছেলেটা,যে বলেছিলো তার কপালের উপর কেটলি বসিয়ে দিতে। শুভ্র’র কয়েকটা
ঘটনা মনে পড়ে। মনে পড়ে ভাবতাম হিমু হলুদ পাঞ্জাবির তলে পকেটওয়ালা প্যান্ট বা
আদৌ কিছু পরতো কি না,আর ভাবতাম আপনি এতো অযৌক্তিক কেন? কেন বোঝেন না,আপনার নায়ককে শুধু হলুদ পঞ্জাবি পরালেই তার পোশাক সম্পূণ
হয় না? ‘মেঘ বলেছে যাব
যাব’র হাসান হঠাৎ রাস্তায় ঠেলাগাড়ির তলে চলে যাওয়ার কথা মনে পড়ে। ভাবতাম,কেন মিসির আলি’র চিন্তা-ভাবনা শতভাগ যৌক্তিক হলেও যেসব রহস্য
নিয়ে সে চিন্তা করছে সে গুলো সব অবাস্তব অলৌকিক কাহিনী? হিমু বা মিসির আলী আমাকে সবার মতো মোহগ্রস্থ করতে পারে নি।
এমন অনেক বই’ই আছে যেগুলো পড়ার পর চরম বিরক্ত হয়েছি। মনে হয়েছে
সময়টাই নষ্ট হলো। তবে মোহগ্রস্থ করেছে বেশিরভাগই। চাঁদের আলোয় কয়েকজন যুবক, দারুচিনি দ্বীপ,পেন্সিলে আঁকা
পরী আরো অনেক বই। আর মোহগ্রস্থ করেছিল আপনাকে নিয়ে আমার বড় ভাইয়ের একটা
মন্তব্য। তিনি প্রায় ২০/২২ বছর আগে আমাকে বলেছিলেন,‘মানুষের যে গ্রে ম্যাটার থাকে,হুমায়ূন আহমেদ-এর সেটা বোধহয় গ্রে না,ব্ল্যাক।’
সে বছর
বইমেলার কথা আমার সারাজীবন মনে থাকবে। কারন সেবারই আমার মা আমাকে প্রথম এবং
শেষবারের মতো ঐ মেলায় নিয়ে গিয়েছিলেন। আমি কিনেছিলাম আপনার ‘কিশোর সমগ্র’ বইটি। অজস্রবার পড়েছি ‘সূযের দিন’ আর ‘বোতল ভূত’। ততদিন প্রেমে পড়ে
গেছি আপনার লেখার। খুঁজে খুঁজে বের করছি আপনার আগের লেখাগুলি আর পড়ছি- অন্ধকারের
গান,শঙ্খনীল কারাগার,আকাশ জোড়া
মেঘ,নন্দিত নরকে।
বিটিভিতে সে
সময় অয়োময় চলছিলো। আমি এবং আমাদের পরিবারের সবাই ছিলাম সে সময়কার বিটিভি’র নাটকগুলির
নাছোড়বান্দা দর্শক। আমি তো অনেক ছোটবেলায় দেখা আরো অনেক নাটকের কথাও মনে করতে
পারি-এইসব দিনরাত্রি,একদিন হঠাৎ অথবা বহুব্রীহি। আপনার ‘কোথাও কেউ নেই’ আমাকে কষ্ট দিয়েছিলো আর সবার মতোই। তবে আমি মিছিলে যাইনি। আমি ভাইয়ার
মন্তব্যটার কথা ভাবতাম আর আপনার এই সব কীর্তির সাথে মেলাতাম। কি আশ্চর্য শক্তিশালী
এইসব সৃষ্টি আপনার! সাদেক আলি’র স্যালাইন বানানো,জাহিদ হাসানের
নেশাখোরের অভিনয় শেষে ‘সকাতরে ঐ’ গানটা – এসবও মাথায় রেকর্ড
করা আছে যেন!
কিভাবে কখন এই
মোহ কেটে গেল তা বলা মুশকিল। তবে নাটক থেকে চোখ সরেনি তখনো। লেখা থেকে সরে গেছে। মেঘ বলেছে যাব যাব কয়েকবার পড়ার পর মনে হলো,এই অসাধারণ উপন্যাসটাই হোক আমার পড়া আপনার শেষ উপন্যাস।
যদিও নিজের কাছে সে কথা আমি রাখিনি। আপনি যেমন ক্যানসারের সাথে যুদ্ধ শেষে ফিরে
আসবেন বলেও ফিরলেন না। আর এখন তো ভাবছি আবার নতুন করে বোতল ভূত,সূর্যের দিন,আশাবরী,শুভ্র - সব পড়া শুরু
করবো। কিনবো,রাখবো,আমার সন্তানকে
দেবো এবং পড়তে বলবো। তবু এক অর্থে সেটা ছিলো একটা ‘শেষ’ এবং একমাত্র আপনিই
জানেন যে সেটা অর্থে। একমাত্র আপনিই জানেন যে কিভাবে হলো ‘শেষ’ এবং আরো কত
অন্যরকম ভাবে হতে পারতো এই ‘শেষ’।
No comments:
Post a Comment