রোদে
ঝক ঝক। শ্রাবণ মাইসা রোদ। হঠাৎ শ্রাবণ মাসে
কখনও এমন রোদ ঝকমারি খায় যেন তামাম বিশুদ্ধ রোদ বর্ষায় ধুয়ে কেবল নামল। খোলা
প্রশস্ত পথ আলোয় ভরানো। দুই পাশে পর পর যত্নের বাড়ি-ঘর সাজানো। মুহি
খোলা রাস্তার এক প্রান্ত ধরে সরলরেখায় হাঁটতে লাগলো। নির্জীব পা দুটো
ক্রমেই সচল আর দুরন্ত হয়ে উঠছে। যদিও খালিশপুরের পথগুলোই এরকম
হাঁটতে শুরু করলে দু’পায়ে কন্ট্রোল থাকেনা। পথের দুই পাশে সারি সারি
মেহগুনি,শিশু,শিরিষ আরো অন্যান্য বৃক্ষ। বৃক্ষগুলো
অনেক উপরে উঠে নুয়ে বেঁকে গেছে। রাস্তার ফাঁকে ফাঁকে ছেঁড়া ছেঁড়া
রোদ। ছেঁড়া ছেঁড়া রোদ পার হয়ে মুহি হাঁটছে। বিক্ষিপ্ত
বিচ্ছিন্ন ভাব তার হাঁটায়। গায়ে কুচ কুচে কালো পাঞ্জাবি
সাথে নীলাভ জিন্স। হাঁটতে হাঁটতে মুহি হঠাৎ লক্ষ্য করলো যে রাস্তায় কোন
পাখির ডাক পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে না। বৃক্ষে,বিদ্যুতের
তারে,কিংবা বাড়ির ছাদের কার্ণিশে কোথাও একটি পাখিও নেই। এমন
কি একটি কাক পর্যন্ত না। খালিশপুর কাকের শহর। এখানে দিনের বেলায়
কোন কাকের ডাক শোনা যাবে না এটা বিরল ঘটনা। প্রতি সেকেন্ড
সচেতন ভাবে কান পেতে রাখলে এমন একটি সেকেন্ড হয়তো পাওয়া অসম্ভব হবে যে একটি কাক
অন্তত ডেকে ওঠে নি। মুহি তার কানকে অপেক্ষার থালার মতো পেতে রাখলো। হাঁটতে
থাকলে তার কান খুলে যায়। বহুদূরের শব্দও তাকে এক অদ্ভুত ঘোরে ঘিরে রাখে। পাখির
ডাক তার কাছে নেশার মতো। নানা রঙের পাখির ডাক শুনে কানের ছাকুনি দিয়ে
আলাদা করার এক অদ্ভুত মজা তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। তার মনে হচ্ছে
কোথাও যেন দু’একটি পাখি দূরেদূরে
ডেকে যাচ্ছে। মুহি তা কানে আনতে পারছে না। সে ভীষণ অন্যমনস্ক
হয়ে হাঁটছে। অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটলেও তার পা গুনে গুনে কেবল ঘুরে ফিরে
মুনাদের বাড়ির সামনেই এসে দাঁড়ায়। মাঝে মাঝে সে সচেতন ভাবে অন্য
লক্ষ্য নিয়ে হাঁটতে শুরু করে দেখেছে যে তার গন্তব্যের তেমন পরিবর্তন হয় না। মুনা
বি,এল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। বরণ
তার অদ্ভুত কিছুটা উজ্জ্বল শ্যামলা আবার তামাটে। পোশাকে ব্যবহারে
সমান মার্জিত এবং রুচিশীল। কপালে চিকন দুই ভ্রু’র মাঝখানে নিখুঁত
কালো পরমাণু টিপ তার শরীরেরই অংশ। যখন সে হেঁটে যায় মনে হয় যেন
চারপাশে বাতাসের শো শো আওয়াজ ছাড়া পৃথিবীর আর মানে নেই। মুহির একটু ঠোট
কাঁটা টাইপের আর ধৈর্য্যও তার একেবারে নেই বললে চলে। অধৈর্য হয়ে কলেজে
একদিন প্রথম মুনার পথ আগলে বলেছিলো-
আচ্ছা
আমি কি আপনার সাথে পরিচিত হতে পারি?
মুনা সেদিন খুব সহজ সাবলীল ভাষায় বলেছিল-
হ্যাঁ,আমি মুনা,আপনি?
সাধারণত কলেজের মেয়েদের সাথে একটু যেচে কথা বললে প্রথম পরিচয়ে সবাই একটু ঘাইঘুই করে, ভাব নেয়,ন্যাকামির মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু মুনার এরকম সাবলীল উত্তর মুহিরের কাছে সত্যিই খুব অপ্রত্যাশিত ছিল। বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিলো মুহি।
আমি মুহি,অনার্স ফাইনাল ইয়ার,অর্থনীতি।
কিছুটা বিরক্তি নিয়ে মুনা বললো- আর কিছু?
না এতোটুকুই।
মুহি এই মুগ্ধতা বয়ে বেড়ালো অনেক দিন পর্যন্ত। কখনো ক্যাম্পাসে মুনাকে দেখলে নির্বিকার এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো। মুনার ভ্রুক্ষেপ মিলতো না। বেশ কিছুদিন পরে মুহি একদিন সাহসে তাকে থামিয়ে ডেকে বললো-
মুনা কি ব্যস্ত?
আবারও কিছু বলতে চান?
হু,ভালো আছেন?
জি,আপনি ভালো?
হ্যাঁ,আপনি কি এনগেজড?
জি,ইকবাল সারের ক্লাস তারপর প্রাইভেট তারপর বাড়ি।
আমি এরকম কিছু জানতে চাইনি।
ও...রিলেশন?
হ্যাঁ,এরকম।
জি,হিমু।
আমাদের কলেজের কেউ?
মুনা কিছুটা বিস্ময় নিয়ে তাকালো মুহির দিকে। যেন প্রশ্নটাতে মহা অন্যায় মেশানো ছিলো। কপালের ভাঁজ টেনে টেনে একটু চটে যাওয়া ভঙ্গিতে বললো-
হুমায়ূন পড়েছেন?
কিছু কিছু।
তাহলে এ প্রশ্নটা আপনার জানা থাকা উচিত, বলেই মুনা হন হন করে হেঁটে চলে গেলো। মুনা চলে গেল যেন এক দীর্ঘ ছায়া ফেলে মুহির ভেতরে। মুহি নিজের ভেতর হিমুর স্কেচ আঁকতে চেষ্ঠা করলো। হিমু স্বভাব ধারণ করার জন্য প্রায়ই হলুদ পাঞ্জাবি পড়ে সে নিয়মিত কলেজে আসা শুরু করলো। কখনও সে হিমু বেশে মুনার মুখোমুখি হতে চাইতো। মুনার ভ্রুক্ষেপ মিলতো না। একদিন মুনা মুখোমুখি অস্বস্তিকর অবস্থা সম্মুখীন হলে একটু ক্ষেপে বলে উঠেছিলো-
শোনেন মুহি,হিমু কোন পোশাকি বিষয় নয়। হলুদ পাঞ্জাবিতে হিমু নেই। হিমু স্বভাবের নাম। আমাদের এইসব থার্ডক্লাস মার্কা সামাজিক জটিলতা বা হীনমন্যতায় হিমু আক্রান্ত নয়। হিমু সাধারণ মানুষ। খুব সাধারণ। লোক লজ্জার বালাই নেই তার। চাইলে অসামাজিক ও বলতে পারেন। জ্যোৎস্নায় সাজানো তার তাবৎ সংসার। আপনি হিমু সাজার যে ব্যর্থ চেষ্টা করছেন ভালো, তবে এভাবে আমাকে দয়া করে ডিস্টার্ব করবেন না। হিমু হওয়া যায় না হিমু জন্মায়- বলে মুনা আবার এক অন্য রকম বিস্ময়ের দীর্ঘ ছায়া ফেলে হন হন করে চলে গেল।
মুনার এরকম পরিণত চোখ যেন মুহির ভেতরের ভাঁজ খুলে দিয়েছিলো সেদিন। কানে বাজতে বাজতে কখন যে হৃদয়ে পৌঁছে গিয়েছিল হিমুর মন্ত্র তা সে নিজে ও বুঝতে পারেনি। অবশেষে মুনাই মুহিকে একদিন হিমু নামে প্রশয় দিয়েছিল। তারপর কতো বর্ষায়-জ্যোৎস্নায় তারা এক হয়ে গিয়েছিল। একসাথে কতদিন ফুচকা-চটপটি খেয়ে রাত করে তারা বাড়ি ফিরেছিলো, সেসব দিনের কথা এখন আর মনে নেই মুনার। অবশ্য সে এখন আর মনেও করতে চায় না। গতরাতেই মুহির সাথে মুনার শেষ কথা। তারপর সেট অফ। আগামী শুক্রবার মুনার বিয়ে। পাত্র অসামান্য ব্যবসায়ী। ধন-সম্পদে পাতা পাতা। রাতে মুনা তাই বলছিল হিমুদের তো সংসার নেই। গাড়ি-বাড়ি নেই। মেয়েদের জীবন গাড়ী-বাড়ি-সংসারের বাহিরে যেতে পারেনা। পারলে নিজেকে বদলে নিয়ে নতুন করে সংসারের জন্য ভাব। এরকম অগোছালো জীবন বেশী দিন যেতে পারেনা।
মুহির গতরাতে মুনার সাথে কথা শেষ হওয়ার পর সারারাত নির্ঘুম কেটেছে। গভীর রাতে ছাদে জ্যোৎস্নার জন্য অপেক্ষা করে করে সে অস্থির হয়ে আকাশে অভিমান বকে যাচ্ছিল। গতরাতে ছিল ঘোর অমাবস্যা। গতরাত গতই হয়ে গেলে। মুহি খালিশপুরের রোদ বিছানো পথ ধরে হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে কদম গুনে আবার মুনা বাসার সামনে ফেরা। পাকিস্তান আমলের দোতলা বাড়ি। বাড়ির চারপাশ বৃক্ষের মায়ায় জড়ানো। করুণ হয়ে আছে মুনার নিজ হাতে লাগানো শিউলি ফুল গাছ। মুহি সিঁড়ি ধরে উপরে চলে গেল। কলিংবেল নষ্ট। কড়া নেই। কাঠের দরজায় ঠক ঠক শব্দ করে উপস্থিতি জানানোর চেষ্টা। ঠক ঠক। সাড়া মিললো না। হয়তো এখনও সবাই জেগে ওঠেনি। অথবা সচেতন ভাবেই কেউ এসে দরজা খুলে দাঁড়ালো না। মুহি আস্তে আবার সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো নিচে। আবার রাস্তায়। যেন সমস্ত নীরবতায় বুঁদ হয়ে একজন যুবক মিশে যাচ্ছে হাওয়ায়। রাস্তায় ছেঁড়া ছেঁড়া রোদ। ছেঁড়া রোদ পার হয়ে হেয়ে মুহি হাঁটছে।
মুনা সেদিন খুব সহজ সাবলীল ভাষায় বলেছিল-
হ্যাঁ,আমি মুনা,আপনি?
সাধারণত কলেজের মেয়েদের সাথে একটু যেচে কথা বললে প্রথম পরিচয়ে সবাই একটু ঘাইঘুই করে, ভাব নেয়,ন্যাকামির মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু মুনার এরকম সাবলীল উত্তর মুহিরের কাছে সত্যিই খুব অপ্রত্যাশিত ছিল। বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিলো মুহি।
আমি মুহি,অনার্স ফাইনাল ইয়ার,অর্থনীতি।
কিছুটা বিরক্তি নিয়ে মুনা বললো- আর কিছু?
না এতোটুকুই।
মুহি এই মুগ্ধতা বয়ে বেড়ালো অনেক দিন পর্যন্ত। কখনো ক্যাম্পাসে মুনাকে দেখলে নির্বিকার এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো। মুনার ভ্রুক্ষেপ মিলতো না। বেশ কিছুদিন পরে মুহি একদিন সাহসে তাকে থামিয়ে ডেকে বললো-
মুনা কি ব্যস্ত?
আবারও কিছু বলতে চান?
হু,ভালো আছেন?
জি,আপনি ভালো?
হ্যাঁ,আপনি কি এনগেজড?
জি,ইকবাল সারের ক্লাস তারপর প্রাইভেট তারপর বাড়ি।
আমি এরকম কিছু জানতে চাইনি।
ও...রিলেশন?
হ্যাঁ,এরকম।
জি,হিমু।
আমাদের কলেজের কেউ?
মুনা কিছুটা বিস্ময় নিয়ে তাকালো মুহির দিকে। যেন প্রশ্নটাতে মহা অন্যায় মেশানো ছিলো। কপালের ভাঁজ টেনে টেনে একটু চটে যাওয়া ভঙ্গিতে বললো-
হুমায়ূন পড়েছেন?
কিছু কিছু।
তাহলে এ প্রশ্নটা আপনার জানা থাকা উচিত, বলেই মুনা হন হন করে হেঁটে চলে গেলো। মুনা চলে গেল যেন এক দীর্ঘ ছায়া ফেলে মুহির ভেতরে। মুহি নিজের ভেতর হিমুর স্কেচ আঁকতে চেষ্ঠা করলো। হিমু স্বভাব ধারণ করার জন্য প্রায়ই হলুদ পাঞ্জাবি পড়ে সে নিয়মিত কলেজে আসা শুরু করলো। কখনও সে হিমু বেশে মুনার মুখোমুখি হতে চাইতো। মুনার ভ্রুক্ষেপ মিলতো না। একদিন মুনা মুখোমুখি অস্বস্তিকর অবস্থা সম্মুখীন হলে একটু ক্ষেপে বলে উঠেছিলো-
শোনেন মুহি,হিমু কোন পোশাকি বিষয় নয়। হলুদ পাঞ্জাবিতে হিমু নেই। হিমু স্বভাবের নাম। আমাদের এইসব থার্ডক্লাস মার্কা সামাজিক জটিলতা বা হীনমন্যতায় হিমু আক্রান্ত নয়। হিমু সাধারণ মানুষ। খুব সাধারণ। লোক লজ্জার বালাই নেই তার। চাইলে অসামাজিক ও বলতে পারেন। জ্যোৎস্নায় সাজানো তার তাবৎ সংসার। আপনি হিমু সাজার যে ব্যর্থ চেষ্টা করছেন ভালো, তবে এভাবে আমাকে দয়া করে ডিস্টার্ব করবেন না। হিমু হওয়া যায় না হিমু জন্মায়- বলে মুনা আবার এক অন্য রকম বিস্ময়ের দীর্ঘ ছায়া ফেলে হন হন করে চলে গেল।
মুনার এরকম পরিণত চোখ যেন মুহির ভেতরের ভাঁজ খুলে দিয়েছিলো সেদিন। কানে বাজতে বাজতে কখন যে হৃদয়ে পৌঁছে গিয়েছিল হিমুর মন্ত্র তা সে নিজে ও বুঝতে পারেনি। অবশেষে মুনাই মুহিকে একদিন হিমু নামে প্রশয় দিয়েছিল। তারপর কতো বর্ষায়-জ্যোৎস্নায় তারা এক হয়ে গিয়েছিল। একসাথে কতদিন ফুচকা-চটপটি খেয়ে রাত করে তারা বাড়ি ফিরেছিলো, সেসব দিনের কথা এখন আর মনে নেই মুনার। অবশ্য সে এখন আর মনেও করতে চায় না। গতরাতেই মুহির সাথে মুনার শেষ কথা। তারপর সেট অফ। আগামী শুক্রবার মুনার বিয়ে। পাত্র অসামান্য ব্যবসায়ী। ধন-সম্পদে পাতা পাতা। রাতে মুনা তাই বলছিল হিমুদের তো সংসার নেই। গাড়ি-বাড়ি নেই। মেয়েদের জীবন গাড়ী-বাড়ি-সংসারের বাহিরে যেতে পারেনা। পারলে নিজেকে বদলে নিয়ে নতুন করে সংসারের জন্য ভাব। এরকম অগোছালো জীবন বেশী দিন যেতে পারেনা।
মুহির গতরাতে মুনার সাথে কথা শেষ হওয়ার পর সারারাত নির্ঘুম কেটেছে। গভীর রাতে ছাদে জ্যোৎস্নার জন্য অপেক্ষা করে করে সে অস্থির হয়ে আকাশে অভিমান বকে যাচ্ছিল। গতরাতে ছিল ঘোর অমাবস্যা। গতরাত গতই হয়ে গেলে। মুহি খালিশপুরের রোদ বিছানো পথ ধরে হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে কদম গুনে আবার মুনা বাসার সামনে ফেরা। পাকিস্তান আমলের দোতলা বাড়ি। বাড়ির চারপাশ বৃক্ষের মায়ায় জড়ানো। করুণ হয়ে আছে মুনার নিজ হাতে লাগানো শিউলি ফুল গাছ। মুহি সিঁড়ি ধরে উপরে চলে গেল। কলিংবেল নষ্ট। কড়া নেই। কাঠের দরজায় ঠক ঠক শব্দ করে উপস্থিতি জানানোর চেষ্টা। ঠক ঠক। সাড়া মিললো না। হয়তো এখনও সবাই জেগে ওঠেনি। অথবা সচেতন ভাবেই কেউ এসে দরজা খুলে দাঁড়ালো না। মুহি আস্তে আবার সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো নিচে। আবার রাস্তায়। যেন সমস্ত নীরবতায় বুঁদ হয়ে একজন যুবক মিশে যাচ্ছে হাওয়ায়। রাস্তায় ছেঁড়া ছেঁড়া রোদ। ছেঁড়া রোদ পার হয়ে হেয়ে মুহি হাঁটছে।

No comments:
Post a Comment