মুহির রোদ বিছানো পথ ।। সুলতান মাহমুদ রতন



রোদে ঝক ঝকশ্রাবণ মাইসা রোদহঠাৎ শ্রাবণ মাসে কখনও এমন রোদ ঝকমারি খায় যেন তামাম বিশুদ্ধ রোদ বর্ষায় ধুয়ে কেবল নামলখোলা প্রশস্ত পথ আলোয় ভরানোদুই পাশে পর পর যত্নের বাড়ি-ঘর সাজানোমুহি খোলা রাস্তার এক প্রান্ত ধরে সরলরেখায় হাঁটতে লাগলোনির্জীব পা দুটো ক্রমেই সচল আর দুরন্ত হয়ে উঠছেযদিও খালিশপুরের পথগুলোই এরকম হাঁটতে শুরু করলে দুপায়ে কন্ট্রোল থাকেনাপথের দুই পাশে সারি সারি মেহগুনি,শিশু,শিরিষ আরো অন্যান্য বৃক্ষবৃক্ষগুলো অনেক উপরে উঠে নুয়ে বেঁকে গেছেরাস্তার ফাঁকে ফাঁকে ছেঁড়া ছেঁড়া রোদছেঁড়া ছেঁড়া রোদ পার হয়ে মুহি হাঁটছেবিক্ষিপ্ত বিচ্ছিন্ন ভাব তার হাঁটায়গায়ে কুচ কুচে কালো পাঞ্জাবি সাথে নীলাভ জিন্সহাঁটতে হাঁটতে মুহি হঠাৎ লক্ষ্য করলো যে রাস্তায় কোন পাখির ডাক পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে নাবৃক্ষে,বিদ্যুতের তারে,কিংবা বাড়ির ছাদের কার্ণিশে কোথাও একটি পাখিও নেইএমন কি একটি কাক পর্যন্ত নাখালিশপুর কাকের শহরএখানে দিনের বেলায় কোন কাকের ডাক শোনা যাবে না এটা বিরল ঘটনাপ্রতি সেকেন্ড সচেতন ভাবে কান পেতে রাখলে এমন একটি সেকেন্ড হয়তো পাওয়া অসম্ভব হবে যে একটি কাক অন্তত ডেকে ওঠে নিমুহি তার কানকে অপেক্ষার থালার মতো পেতে রাখলোহাঁটতে থাকলে তার কান খুলে যায়বহুদূরের শব্দও তাকে এক অদ্ভুত ঘোরে ঘিরে রাখেপাখির ডাক তার কাছে নেশার মতোনানা রঙের পাখির ডাক শুনে কানের ছাকুনি দিয়ে আলাদা করার এক অদ্ভুত মজা তাকে আচ্ছন্ন করে রাখেতার মনে হচ্ছে কোথাও যেন দুএকটি পাখি দূরেদূরে ডেকে যাচ্ছেমুহি তা কানে আনতে পারছে নাসে ভীষণ অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটছেঅন্যমনস্ক হয়ে হাঁটলেও তার পা গুনে গুনে কেবল ঘুরে ফিরে মুনাদের বাড়ির সামনেই এসে দাঁড়ায়মাঝে মাঝে সে সচেতন ভাবে অন্য লক্ষ্য নিয়ে হাঁটতে শুরু করে দেখেছে যে তার গন্তব্যের তেমন পরিবর্তন হয় নামুনা বি,এল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্রীবরণ তার অদ্ভুত কিছুটা উজ্জ্বল শ্যামলা আবার তামাটেপোশাকে ব্যবহারে সমান মার্জিত এবং রুচিশীলকপালে চিকন দুই ভ্রুর মাঝখানে নিখুঁত কালো পরমাণু টিপ তার শরীরেরই অংশযখন সে হেঁটে যায় মনে হয় যেন চারপাশে বাতাসের শো শো আওয়াজ ছাড়া পৃথিবীর আর মানে নেইমুহির একটু ঠোট কাঁটা টাইপের আর ধৈর্য্যও তার একেবারে নেই বললে চলেঅধৈর্য হয়ে কলেজে একদিন প্রথম মুনার পথ আগলে বলেছিলো- 
আচ্ছা আমি কি আপনার সাথে পরিচিত হতে পারি?
মুনা সেদিন খুব সহজ সাবলীল ভাষায় বলেছিল-
হ্যাঁ,আমি মুনা,আপনি?
সাধারণত কলেজের মেয়েদের সাথে একটু যেচে কথা বললে প্রথম পরিচয়ে সবাই একটু ঘাইঘুই করে, ভাব নেয়,ন্যাকামির মাত্রা ছাড়িয়ে যায়
কিন্তু মুনার এরকম সাবলীল উত্তর মুহিরের কাছে সত্যিই খুব অপ্রত্যাশিত ছিলবেশ ঘাবড়ে গিয়েছিলো মুহি
আমি মুহি,অনার্স ফাইনাল ইয়ার,অর্থনীতি

কিছুটা বিরক্তি নিয়ে মুনা বললো- আর কিছু?
না এতোটুকুই

মুহি এই মুগ্ধতা বয়ে বেড়ালো অনেক দিন পর্যন্ত
কখনো ক্যাম্পাসে মুনাকে দেখলে নির্বিকার এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতোমুনার ভ্রুক্ষেপ মিলতো নাবেশ কিছুদিন পরে মুহি একদিন সাহসে তাকে থামিয়ে ডেকে বললো-
মুনা কি ব্যস্ত?
আবারও কিছু বলতে চান?
হু,ভালো আছেন?
জি,আপনি ভালো?
হ্যাঁ,আপনি কি এনগেজড?
জি,ইকবাল সারের ক্লাস তারপর প্রাইভেট তারপর বাড়ি

আমি এরকম কিছু জানতে চাইনি

ও...রিলেশন?
হ্যাঁ,এরকম

জি,হিমু

আমাদের কলেজের কেউ?
মুনা কিছুটা বিস্ময় নিয়ে তাকালো মুহির দিকে
যেন প্রশ্নটাতে মহা অন্যায় মেশানো ছিলোকপালের ভাঁজ টেনে টেনে একটু চটে যাওয়া ভঙ্গিতে বললো-
হুমায়ূন পড়েছেন?
কিছু কিছু

তাহলে এ প্রশ্নটা আপনার জানা থাকা উচিত, বলেই মুনা হন হন করে হেঁটে চলে গেলো
মুনা চলে গেল যেন এক দীর্ঘ ছায়া ফেলে মুহির ভেতরেমুহি নিজের ভেতর হিমুর স্কেচ আঁকতে চেষ্ঠা করলোহিমু স্বভাব ধারণ করার জন্য প্রায়ই হলুদ পাঞ্জাবি পড়ে সে নিয়মিত কলেজে আসা শুরু করলোকখনও সে হিমু বেশে মুনার মুখোমুখি হতে চাইতোমুনার ভ্রুক্ষেপ মিলতো নাএকদিন মুনা মুখোমুখি অস্বস্তিকর অবস্থা সম্মুখীন হলে একটু ক্ষেপে বলে উঠেছিলো-
শোনেন মুহি,হিমু কোন পোশাকি বিষয় নয়
হলুদ পাঞ্জাবিতে হিমু নেইহিমু স্বভাবের নামআমাদের এইসব থার্ডক্লাস মার্কা সামাজিক জটিলতা বা হীনমন্যতায় হিমু আক্রান্ত নয়হিমু সাধারণ মানুষখুব সাধারণলোক লজ্জার বালাই নেই তারচাইলে অসামাজিক ও বলতে পারেনজ্যোৎস্নায় সাজানো তার তাবৎ সংসারআপনি হিমু সাজার যে ব্যর্থ চেষ্টা করছেন ভালো, তবে এভাবে আমাকে দয়া করে ডিস্টার্ব করবেন নাহিমু হওয়া যায় না হিমু জন্মায়- বলে মুনা আবার এক অন্য রকম বিস্ময়ের দীর্ঘ ছায়া ফেলে হন হন করে চলে গেল
মুনার এরকম পরিণত চোখ যেন মুহির ভেতরের ভাঁজ খুলে দিয়েছিলো সেদিন
কানে বাজতে বাজতে কখন যে হৃদয়ে পৌঁছে গিয়েছিল হিমুর মন্ত্র তা সে নিজে ও বুঝতে পারেনিঅবশেষে মুনাই মুহিকে একদিন হিমু নামে প্রশয় দিয়েছিলতারপর কতো বর্ষায়-জ্যোৎস্নায় তারা এক হয়ে গিয়েছিলএকসাথে কতদিন ফুচকা-চটপটি খেয়ে রাত করে তারা বাড়ি ফিরেছিলো, সেসব দিনের কথা এখন আর মনে নেই মুনারঅবশ্য সে এখন আর মনেও করতে চায় নাগতরাতেই মুহির সাথে মুনার শেষ কথাতারপর সেট অফআগামী শুক্রবার মুনার বিয়েপাত্র অসামান্য ব্যবসায়ীধন-সম্পদে পাতা পাতারাতে মুনা তাই বলছিল হিমুদের তো সংসার নেইগাড়ি-বাড়ি নেইমেয়েদের জীবন গাড়ী-বাড়ি-সংসারের বাহিরে যেতে পারেনাপারলে নিজেকে বদলে নিয়ে নতুন করে সংসারের জন্য ভাবএরকম অগোছালো জীবন বেশী দিন যেতে পারেনা
মুহির গতরাতে মুনার সাথে কথা শেষ হওয়ার পর সারারাত নির্ঘুম কেটেছে
গভীর রাতে ছাদে জ্যোৎস্নার জন্য অপেক্ষা করে করে সে অস্থির হয়ে আকাশে অভিমান বকে যাচ্ছিলগতরাতে ছিল ঘোর অমাবস্যাগতরাত গতই হয়ে গেলেমুহি খালিশপুরের রোদ বিছানো পথ ধরে হাঁটছেহাঁটতে হাঁটতে কদম গুনে আবার মুনা বাসার সামনে ফেরাপাকিস্তান আমলের দোতলা বাড়িবাড়ির চারপাশ বৃক্ষের মায়ায় জড়ানোকরুণ হয়ে আছে মুনার নিজ হাতে লাগানো শিউলি ফুল গাছমুহি সিঁড়ি ধরে উপরে চলে গেলকলিংবেল নষ্টকড়া নেইকাঠের দরজায় ঠক ঠক শব্দ করে উপস্থিতি জানানোর চেষ্টাঠক ঠকসাড়া মিললো নাহয়তো এখনও সবাই জেগে ওঠেনিঅথবা সচেতন ভাবেই কেউ এসে দরজা খুলে দাঁড়ালো নামুহি আস্তে আবার সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো নিচেআবার রাস্তায়যেন সমস্ত নীরবতায় বুঁদ হয়ে একজন যুবক মিশে যাচ্ছে হাওয়ায়রাস্তায় ছেঁড়া ছেঁড়া রোদছেঁড়া রোদ পার হয়ে হেয়ে মুহি হাঁটছে

No comments:

Post a Comment