পরীর মেয়ে মেঘবতী ও একটি আপন নক্ষত্র ।। আশরাফুল আলম


স্কুলপড়ুয়া এক বালক তার স্কুল লাইব্রেরী থেকে একটা ঝা-চকচকে বই ধার করল।  বইয়ের নাম - পরীর মেয়ে মেঘবতীপাতায় পাতায় রঙ-বেরঙের ছবি আর মাতাল মাতাল গন্ধ। বাসায় এসে দুপুরের খাওয়া শেষে এক নিঃশ্বাসে বইটা পড়ে ফেলল সে। তার অদ্ভুত লাগলকারণ বইটা যেন তাকে নিয়েই লেখা! বইয়ের মূল চরিত্র নাবিলও তার মতো একজন বালকএবং একটা জিনিস নাবিলের সাথে তার দারুণ মিলে গেছেসেও সম্প্রতি নাবিলের মতো আলাদা একটা রুম পেয়েছে। মায়ের কোল ছেড়ে এই প্রথম সে নিজের রুমে নিজের মতো করে থাকা শিখছে । একদিন নাবিল নামের ছেলেটার রুমে একটা পরীর মেয়ে এসেছিল। টুকটুকে আর মিষ্টি সেই মেয়ের নাম মেঘবতী। বালকও রাতের বেলা পাশবালিশ জড়িয়ে ধরে পরীর মেয়ে মেঘবতীর জন্য অপেক্ষা করতো। এই অপেক্ষা একটুও ক্লান্তিকর নয়বরঙ নানীর পান খাওয়া মুখে বলা কড়ে আঙ্গুলে-র কেচ্ছার মতো রোমাঞ্চের

বালকটি হচ্ছি আমিআর পরীর মেয়ে মেঘবতীর স্রষ্টা হুমায়ুন আহমেদের সাথে ঐ আমার প্রথম পরিচয়এবং প্রথম পরিচয়ে প্রেমও বটে

প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুপরবর্তী প্রথম জন্মদিনইচ্ছে হল তাঁকে নিয়ে কিছু লিখি। সমালোচনার কাঁটাছেড়ায় কাতর প্রবন্ধ নয়একান্ত নিজস্ব কিছু অনুভূতি : টুকরো টাকরা আবেগের ফুল দিয়ে গাঁথা মালার মতোযে মালায় নিয়ম মানা সৌন্দর্য নেইআছে হালকা একটু সৌরভ।  

আমার এসএসসি পরীক্ষা চলছেপরীক্ষাকেন্দ্রের পাশেই একটা লাইব্রেরী। বিকেল হলেই লাইব্রেরীতে চলে যাইএদিক ওদিক তাকাই না। সোজা হুমায়ূনের বইয়ে ডুব মারি। কখন যে হুশ করে সন্ধ্যা নামে টের পাইনা। মফস্বলের নির্জন রাস্তা ধরে ঢুলতে ঢুলতে বাসার দিকে ফিরিসাথে  হিমুমিসির আলীশুভ্রনবনীতিথিজরি... আরো কত চরিত্রআরো কত গল্প। এইভাবে একদিন পড়া হল - নন্দিত নরকে। কি হয়ে গেল বুঝলাম না। বাসায় ফিরেই মাকে জড়িয়ে ধরলাম। মা দেখল তার পাগলা ছেলের চোখে জল। এই হল হুমায়ূনের সাহিত্য

কৈশোরে মনে হতো আমাকেও লিখতে হবেহুবহু হুমায়ূনের মতো করে। একরাতে কি যেন এক ছাইপাশ লিখলাম। প্রকাশভঙ্গি একান্তই হুমায়ূনীয়। এক কিশোরী সেই ছাইয়ে দিল বাতাসরাফখাতায় লেখা আমার মারাত্নক যৌগিক রচনাটার নীচে গোটা গোটা অক্ষরে লিখলোকামনা করি অনেক বড় লেখক হও। হুমায়ূনের বদৌলতে আমার ছোট্ট জীবন পাত্র সেদিন উচ্ছলিয়া গেল। আমার মতো এমন অসংখ্যজনকে হুমায়ূন পড়তে শিখিয়েছেনলিখতে বসার সাহস যুগিয়েছেন। তাই আমরা তাঁকে সস্তা লেখক বলে এক ফুয়ে উড়িয়ে দিতে পারি না

আমার কলেজের বাংলার অধ্যাপক একদিন বলেছিলেনহুমায়ূনকে সময় মনে রাখবে নামৃত্যুর পরপরই তিনি হারিয়ে যাবেন। আমাদের মেইনস্ট্রীম সাহিত্যের অনেক রুই-কাৎলাও তাই মনে করেন। যা ইচ্ছে তাই মনে করার অধিকার সবার আছেকিন্তু সেই মনে করা জিনিসটা যখন পাঁচজনের সামনে ফলাও করে বলা হয় তখন সেই মহারথির হুমায়ূন ক্ষোভের আসল জায়গাটা আমরা পরিষ্কার চিনে ফেলি। ব্যাপারটা বস্তির ন্যাংটো কোন গরীব শিশুর সাথে মিলে যায়যে সাধারণত খেতে পায়না বলে যার মুখে খাবার দেখে তাকেই কষে গালাগাল দেয়। 

এক মহান বৃদ্ধ একটা টিভি অনুষ্ঠানে বলতে চেয়েছিলেনহুমায়ূনের লেখা পরিণত বয়সের পাঠকেরা পড়েন নাতাঁরটা পড়ে। ভালো কথা। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সেই মহান বৃদ্ধের মহান একটা উপন্যাস পড়ে আমাদের প্রথমেই মনে আসলো রসময় গুপ্তের কথা। তাহলে এই চটি গল্পই পরিণত পাঠকের পাঠ্য। ধরণী দ্বিধা হলো আমার তার ভেতরে ঢুকে পড়লাম।            

যে লেখকের বই বাজারে চলে না সেব্রাম্ম আর যারটা চলে সে শুদ্র - এই মন্ত্রবাক্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যকে ঝাঁড়ফুক করলে লাভের চেয়ে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি। আমরা অল্প ক'জন সাহিত্য কুলীনের শীষ্যত্ব গ্রহন করে সাড়ম্বড়ে "কশ্চিত্‍ কান্তাবিরহগুরুণা স্বাধিকারপ্রমত্তঃ" তেলোয়াত করব আর আমজনতা সাহিত্যের আনন্দ নগরে ঢোকার পাসপোর্ট ভিসাই পাবে নাএই প্রথার ভেতর কী এমন কল্যাণ আছে তা আমাদের 'অপরিণতমাথায় খেলে না। রান্নাঘরে বসে যে আলুভাজি করছে হুমায়ূন তাকেও সাহিত্য করার অধিকার দিয়েছেন। এই জন্যই তিনি কিংবদন্তি

বাল্যকৈশোর পার করার সাথে সাথে হুমায়ূনের সম্মোহন অনেকখানি কেটে গেল। কিছু অভিমানকিছু মতবিরোধকিছু একঘেয়েমীতা দানা বাঁধল। তবু কিছু এসে যায় না। অন্ধভক্তিতে তাঁকে ইশ্বর করে তুলিনিসেও রক্তমাংসের সাধারণ মানুষ এটা মাথায় ছিল বলে আমার প্রথম প্রেমিকার ছায়াটা এখনো মুনার। এখনো আমি গুনগুন করি কন্যা ভুল করিস নাকন্যা ভুল করিস নাভুল করা কন্যার সাথে কথা বলবো না

হুমায়ূন আহমেদ অনন্ত নক্ষত্রবিথীর ভেতর কোন নক্ষত্রটা আপনি। একটু ইশারা দিন। আমরা আপনার জন্মদিনের শুভেচ্ছা নিয়ে বসে আছিএবং কি মুশকিলআমাদের চোখ ভিজে উঠছে!

  


No comments:

Post a Comment