কথামুখ


হুমায়ূন আহমেদের জন্ম বাঙালীকে জোছনা দেখতে শেখাল। যদিও হাজার বছর ধরে এই ভূমি প্রতি পুন্নিমার দুধ জোয়ারে প্লাবিত হয়েছে ঠিকই কিন্তু সেই জোছনার ঘোর নিয়ে আহ্লাদ করার মত বেদনার ভীষণ অভাব ছিলো। হুমায়ূন সেই চন্দ্রগ্রস্থ বেদনার কাব্য জন্ম দিলেন তাঁর আঙুল থেকে। একটা ভাষার মানুষেরা দেখল তাদেরই চোখের পাড় ঘেঁসে বয়ে যাওয়া প্রতিদিনের গল্পগুলোর ভিতর কি তীব্র যন্ত্রণা কি আশ্চর্য পরিমাণ আনন্দ বেদনার কাব্য আছে। এবং সে গল্পের রং রস ভাষা দূরসম্পর্কের না বরং পাঠকের পাঁজরের প্রতিবেশের। চার দশক ধরে যে মাতাল হাওয়ায় একজন লেখক ওড়ালেন তাঁর সহসা প্রয়াণ  হজম করতে অন্ত্রের বদলে করোটির  ভিতর যে যন্ত্রণা তৈরি হলো তা বারবার নিরিখ করছে-লেখক নেই, কোথায় লেখক? জাদুকর লেখক কই? চুম্বকের মত যার লেখা একটানে পড়ে শেষ করা যায়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-সত্যজিৎ রায়ের পর এতো বৈচিত্রময় ধারালো প্রতিভা নিয়ে জন্ম হুমায়ূন আহমেদের। উপন্যাসের নাভি থেকে মাথা তুলে ক্রমাগত তিনি তাঁর প্রতিভার ডালপালা ছড়ালেন-ছোটগল্প, কল্পবিজ্ঞান, মঞ্চ নাটক, টিভি নাটক, চলচিত্র এমন কি বাঙলা গানে। এতো গুলো পালকের ভিতর ছবি আঁকাটা আর বাদ যাবে ক্যানো? সেটাও তিনি করেছেন ততটা নিবেশে যতটা মগ্নতায় তিনি ম্যাজিকের  অনুশীলন করতেন। বাংলাদেশের  নাটক-সিনেমার ভাষা তিনি এক ধাক্কায় বদলে দিলেন। তাঁর সেই তীব্র ঘোরের ভাষাজালে আচ্ছন্ন স্বাধীনতা উত্তর থেকে আজকের বাঙালী পাঠক। এবং এর মধ্যে জন্মানো লেখকদের একটা বড় অংশ রয়েছে আক্রান্ত। যা ছিঁড়ে বের হতে আরো অনেক বছর বন্দি থাকতে হবে হয়তো। তরুণদের তিনি যেন ছবি এঁকে শেখালেন কি ভাবে ভালবাসতে,হয় কি ভাবে বিরহ পোহাতে হয়,কেমন মমতা নিয়ে জীবনকে শুকতে হয়। অর্থাৎ আমাদের আবেগকে নিয়ন্ত্রন করলেন তাঁর কলমের ইশারায়।

মহৎ সাহিত্যিক নামে যাঁরা সাহিত্যকে ভাসুর করে তুলেছে। যাঁদের লেখার মুখ কতিপয় জায়েজ আত্মীয়ের সামনে ছাড়া খোলা যায় না তাদের নিয়ে বড় ধন্ধেয় পড়ে যাই। যখন দেখি একজন লেখকের শোকে একটা ভাষার সকল মানুষেরা বাকরুদ্ধ, সার বেঁধে হাজার হাজার তরুণী-বয়সী-যুবক-বালিকারা কাঁদতে কাঁদতে কদম ফুল হাতে না দেখা হুমায়ুন আহমেদের কফিন ছুঁয়ে যায়। তখন মনে হয় এই কেঁদে ফেলা পাঠকেরা কি মহৎ সংজ্ঞার বাইরে? উত্তর অবশ্য আছে, জনপ্রিয়তা তথা পাঠকের প্রতিবেশী হতে না পারার যন্ত্রণাই কি ঐ লেখকদের মহৎ শব্দের ভিতর স্বস্তির আশ্রয় দিয়েছে? কেননা এটা মানতেই হবে পাঠক ছাড়া আসমানি কিতাবও কোন মূল্য রাখে না!

তৃণভূমির এই সংখ্যার জন্য আমরা যখন মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছি ঠিক তখন হুমায়ূন আহমেদ মেঘের উপর বাড়িতে চলে গ্যালেন। আমরা স্তম্ভিত হয়ে রইলাম কিছুদিন এবং সিদ্ধান্ত নিলাম এই সংখ্যার অক্ষরমালা হবে তাঁর প্রতি আমাদের ভালোবাসার তর্পণ। লেখকের জন্ম হয় তাঁর কি প্রয়াণ আছে? তাই হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিনে তৃণভূমির এই পোশাক।

তৃণভূমির লেখকেরা প্রায় সকলে তরুণ। তাঁরা তাঁদের হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে লিখেছেন নিজের অক্ষরে। কোন কোন লেখা ভক্ত পাঠকের পংক্তিতে রচিত, কোনটা প্রিয় লেখকের প্রতি অভিমানের অক্ষরে সাজানো, আবার কোন কোন স্তবক ছুরিকাঁচি নিয়ে বসা আলোচকের ভাষায় ভরে উঠেছে। কেননা আমরা বিশ্বাস করি এই মুক্ত তরুণরাই বাঙলা ভাষার আগামী দিনের ক্ষেত্রকর।

হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে এই সম্পাদকীয় উপরের পংতিতে শেষ করা যেত কিন্তু সেটা ঠিক গদ্যশিল্পী হুমায়ুন আহমেদের সাথে যায় না। কেননা অতি তুচ্ছ বিষয়কেও হুমায়ূন আহমেদ গল্পের রসে ভিজিয়ে বলতেন। কল্পনা করুন পাঠক ভীষণ যুক্তিবাদী মিসির আলী সকালে আপনাকে ফোন করে বলল,ভাই শুনুন হিমু মারা গ্যাছে। আপনি তখন মিসির আলীর ফোন কেটে দিয়ে পাস ফিরে শুতে শুতে একটা মুচকি হাসি হাসলেন, কেননা মিসির আলিও জানেন না আপনিই হিমু।

No comments:

Post a Comment