আমি সৃষ্টিকর্তা হতে চেয়েছিলাম ।। রাসেল মাহমুদ



কিশোরকালে আমার একটা ব্যক্তিগত পাঠাগার ছিল। আমাদের কলোনীর বাসা,তার স্নানঘরের উপরে পরে ব্যবহার হবে এমন কিছু টুকিটাকি থাকতো। ওগুলো বছরে ১ বারও ব্যবহার হতো না। ওখানেই ছিল আমার গল্পের বই রাখার জায়গা। স্নানঘরকে পাঠঘর বানাতে বাধ্য হলাম কারণ আমার মাগল্পের বই পড়তে দেখলেই উচ্চস্বরে চিৎকার করে বকতেন। আমি তাঁর নিরবতা নিশ্চিত করতে এই ব্যবস্থা হাতে নিলাম। দীর্ঘসময় স্নানঘরে থাকায় একবার তার সন্দেহ হলো এবং ধরা খেলাম। অবৈধ জিনিশ রাখার অপরাধে শাস্তি পাবার মতো মার খেলাম। রীতিমতো রাম ধোলাই।
স্কুলে পড়ার সময় আমার এলাকার বন্ধুদের অভিভাবকের কাছে আমি রীতিমতো এক ক্রাইমে পরিণত হয়েছিলাম। কারণ তাদের ছেলে-মেয়েকে আমি নেশাখোর বানিয়ে ফেলেছিলাম। তাদের হাতে তুলে দিয়েছিলাম নিউজপ্রিন্টের বই। মুরুব্বিরা ধাঁধাঁয় পড়ে যেত,পোলাপান কি পড়ে এগুলো!
আমার জীবনের প্রথম উপহার পাওয়া বইটি ছিল একটি শিকারের বই। ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবে মামার কাছ থেকে পাওয়া সেই বইটির নাম ছিল মাকুমামা দি গ্রেটমামার কাছ থেকে তার পর পেলাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কিশোর গল্পের বই হীরে কি গাছে ফলেততদিনে নানা পড়িয়ে শুনিয়ে ফেলেছেন বেশ কিছু রুশ গল্প,মা শুনিয়ে ফেলেছেন বিষাদ সিন্ধু,নানী শুনিয়ে ফেলেছেন আরব্য রজনী-ঠাকুর মার-ঠাকুর দার ঝুলি। এরপর এক পর্যায়ে আমি যখন আর ওগুলো ছাড়া থাকতে পারতাম না তখন শুরু হয় নিজস্ব পাঠ। আমার হাতে আসে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ বইটি আলেক্সান্দার বেলায়েভের উভচর মানুষ।
আমার সেই পাঠভ্যাসের আগুনে ঘি ঢাললো নোমানী (তার উপর শান্তি নাজিল হোক) নামের আমার এক এলাকাতো বড় ভাই। তিনি গোপনে আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন তিনগোয়েন্দাআমি এতটাই আসক্ত হয়ে পড়েছিলাম যে, একপর্যায়ে একটি গোয়েন্দা দল করে ফেললাম দুই বন্ধুকে নিয়ে।
গোয়েন্দা,অ্যাডভেঞ্চার,কুয়াশা,মাসুদ রানা,থ্রিলারে আমার স্কুলজীবনের বইগুলো হয়ে উঠলো গুরুত্বহীন, ফালতু। আমার বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফলও হয়ে উঠতে শুরু করলো ফালতু-তর। মায়ের আক্ষেপ, ছেলে ফার্স্ট হওয়াতো দূরের কথা,দশের মধ্যেও রোল আনতে পারছে না! আমিও বিদেশী বই পড়তে পড়তে এগিয়ে চলেছি, দেশের কৃষাণ আর খামারের বদলে বিদেশী র‍্যাঞ্চ আর কাউবয়রা আমার বন্ধু হয়ে গেছে। তবে স্কুল থেকে দেয়া বোর্ডের বাংলা বইটি (আমার বই-প্রথম ভাগ) ওইদিন সন্ধ্যায় শেষ হয়ে যেত গল্পে কবিতায়...
এরই মাঝে এলাকার মাফিয়া হয়ে আমি বন্ধুদের হাতে ছড়িয়ে দিতে শুরু করেছি সেবার সেই মাদক। তারা সেবন করতো আর আমার কাছ থেকে বদলে নিয়ে যেত। আমিও নিজের বইগুলোর ফাঁকে নিয়ে পড়ছি তো পড়ছি। দুএকবার মায়ের হাতে ধরা খেয়ে প্রচণ্ড মার খেয়েও বিরত থাকা হয়নি। ধরতে হয়েছে ভিন্ন পথ। আর আমারই বদৌলতে আমার স্কুলের কতিপয় বন্ধু,এরপর সমগ্র স্কুল ছেয়ে গেল সেই মাদকে। শিক্ষক ক্লাস নিচ্ছেন আর কতিপয় ছাত্র মাথা নিচু করে পড়ে যাচ্ছে সেবার বই। একবার স্কুলে তল্লাশি চালিয়ে আটক করা হল সেবার বিপুল পরিমাণ বই। তখনকার মুরুব্বিরা চিনতেন দস্যু বনহুর। তিন গোয়েন্দা পর্যন্ত তারা তখনও পৌঁছাননি। নিউজপ্রিন্টের ওই বইগুলো কেন যেন তাদের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছিল। পরে আঁচ করতে পারলাম নিউজপ্রিন্টের বইয়ের ব্যাপারে তাদের আতঙ্কের কারণ। তবে যারা প্রকৃত নিউজপ্রিন্টের দিকে ঝুঁকেছিল,ঠেকানো যায় নি তাদের। গুপ্ত রসে ছেঁয়ে গিয়েছিল আমার কিশোর বন্ধুদের আরেকটি শ্রেণী।
একবার পাঠের জন্য হাতের কাছে কিছু না পেয়ে মামার বুক শেলফ থেকে পাড়লাম নন্দিত নরকে। অপরিচিত স্বাদ! আরও বয়স বাড়লে নন্দিত সে নরক আরও পরিষ্কার হয়ে উঠেছিল। নবম শ্রেণীতে ওঠার পর হঠাৎ যেন অনেকটা বড় হয়ে উঠলাম। তখন আর ছোট সাইজের বইগুলোতে আনন্দ পাচ্ছিলাম না। তিন গোয়েন্দা বন্ধ হয়ে গেল,এক পর্যায়ে লেখক বদলে গেল। হুমায়ুনের হাতে সমর্পিত হলাম। আমার আগে আমার মা টের পেলেন, নেশা কাহাকে বলে-কত প্রকার ও কি কি। তিনি প্রায়ই ছুটে আসতেন আমার ঘরে, ছেলে একা একা হাসে কেন দেখবার জন্য। তিনি প্রায়ই উকি মারেন গভীর রাতে,ছেলে রাত জেগে কি করে দেখার জন্যমায়ের আশঙ্কা মেলে না, এসে দেখেন হাতে হুমায়ুন। তিনি ঘোষণা দিলেন, আমার শোচনীয় ফেল আল্লাও ঠেকাতে পারবে না। একবার আমাকে হাত পা ছড়িয়ে কাঁদছি দেখে মা সন্দেহের চোখে চেয়ে রইলেন,আমার পাশে পড়ে ছিল হুমায়ুনের জনম জনম। জীবনের বহু বিকেল,বহু দুপুর,বহু রাত কাটিয়েছি হুমায়ুনের সঙ্গে।
একসময় খেয়াল করলাম নিজেই লেখক হয়ে উঠছি। হাতে তখন আজাদ,ইলিয়াস,মানিক,ছফাসহ আরও কত কি! মার্কস তখন পয়গম্বর! সমাজতন্ত্রের বইগুলো তখন কোরান,লাল তখন প্রিয় রং। লিটলম্যাগ করছি, সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাচ্ছি মার্কিন পতাকার দিকে। হুমায়ুনকে তখন তাচ্ছিল্য করেছিলাম। তাচ্ছিল্যের বসে তাঁকে নিয়ে গল্পও লিখে ফেললাম একটা। এই কিছু একটা হয়ে ওঠার পেছনে হুমায়ুন বেশ খানিকটা জড়িয়ে ছিলেন। প্রকাশের সাহসটা যেন তার নিজে হাতেই দেয়া।
মিসির আলী,হিমু বা শুভ্র হতে আমার কখনোই ইচ্ছে করেনি। অনেককে দেখেছি হলুদ পাঞ্জাবী পড়ে ঘুরে বেড়াতে,মিসির আলীর ভঙ্গিতে কথা বলতে কিংবা শুভ্রর মতো চশমা পড়তে। গুটিকতক মেয়েকে দেখতাম, রূপা হয়ে জন্মাতে না পারায় যেন তারা ব্যথিত।
আমার কেন যেন এই চরিত্রগুলির সৃষ্টিকর্তার প্রতিই ছিল মূল টান। আমি কখনই ওই চরিত্রগুলো হতে চাইনি। আমি হয়তো সৃষ্টিকর্তা হতে চেয়েছিলাম। আজ তাঁর দৈহিক মৃত্যুর পরের প্রথম জন্মদিবসে মনে হচ্ছে এই সৃষ্টিকর্তারা ইউনিক। এঁদের পুনর্জন্ম হয় না।




1 comment: