Monday, November 12, 2012

জোছনাবতীর চন্দ্র কারিগর ।। রোমেল রহমান



রাত দেড়টায় জেগে উঠে দেখি স্নেহা পাশে নেই। জোছনা রাত হলে নিশ্চিত বলে দেওয়া যেত  স্নেহা কোথায় আছে ! ছাদের ঠিক মাঝখানে কিংবা কাঁচঘরে। কাঁচঘরটা ওর ইচ্ছাতে বানানো। শোবার ঘরের সঙ্গে লাগানো এই জায়গাটা তার খুব প্রিয়। তার ধারণা পৃথিবীর সব থেকে সুন্দর জায়গনগুলোর একটা তার এই কাঁচঘর। পেছন বারান্দার চারদিকটা মেঝ থেকে ছাদ পর্যন্ত   দেয়ালে ঘেরা, এই হল কাঁচ ঘর। জোছনা রাতে এ রকম একটা বারান্দায় অপ্সরীর মত কোন মেয়ে যদি একা একা বসে কাঁদে তবে সে ছবি দেখলে কেন জানি প্রবল বিরহের মত সুখ বুকের ভেতর ভেঙেচুরে নামে।

বিয়ের পরপর স্নেহার এই বাতিক টের পেয়ে মা ভীষণ রাগারাগি করতেন। আমি কিন্তু বুঝতে পারতাম স্নেহা একজন জোছনাবতী। সে এখনো তার বুকের ভেতর পুন্নিমার চাঁদ আটকে রাখতে পেরেছে। যে মানুষটা স্নেহাকে জোছনা দেখতে শিখিয়েছে আমিও তাঁর লেখা পড়ে শিখে ছিলাম। কিন্তু আমি স্নেহার মত অতোটা মমতা নিয়ে ধরে রাখতে পারিনি। ঘরের বুক সেলফ ভরা  তাঁর লেখা বই। বাবার বাড়ি থেকে গাব্দা সাইজের এক সুটকেস বই নিয়ে এসেছিলো স্নেহা। পুরনো বা নতুন কেনা বই মাঝ রাতে পড়তে পড়তে  হাতের পাতায় মুখ ঢেকে বালিকাদের মতো ফুঁপিয়ে স্নেহা এখনো কাঁদে। কিংবা প্রবল বেদনার সুখ নিয়ে নরম বিড়ালের মতো অনেক রাতে আমার বুকের  সাথে নাক মিশিয়ে ঘুমুতে আসে। আমি ওর এই বেঁচে  থাকা নষ্ট করি নি। চারিদিকের ইট-কাঠের ভিতর থাক না স্নেহা একটা সবুজ লতা।

আমাদের বিয়েও হল জোছনা রাতে। বিয়ের প্রথম যে তারিখ ঠিক ছিল তাতে বেঁকে বসলো স্নেহা! বিয়ের কন্যা গোঁ ধরল জোছনা রাত ছাড়া বিয়ে করবে না! বাবা ভীষণ বিরক্ত হলেন তাঁর হবু পুত্র বধূর এই কাণ্ডে । বাসর রাতে স্নেহা বলল, চলো তো ছাদে যাই । আমি বললাম, আহ! বাইরে এখনো অনেক লোক । স্নেহা বলল, তাতে কি? আজকে আমাদের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ দিন আমরা আজ আমাদের মতো কাটাবো । রোজ রোজ তো আর আজ আসবে না! উফফ চলো তো ।

পুন্নিমা তিথির মেঘ চাঁদকে ঢেকে ফেলেছে। আমরা দুজন অধির হয়ে বসে আছি কখন চাঁদ বের হবে। একটা দীর্ঘ মেঘের স্রোত পাড়ি  দিয়ে চাঁদ বের হতেই স্নেহা আমার গা ঘেঁসে দাঁড়ালো। আমি চেয়ে দেখি তার দুচোখের নিচ দিয়ে দুটো রুপালী ধারা , মনে হল বাহ কি আশ্চর্য মেয়ে!

রাতের খাবার না খেয়ে শুয়ে ছিলাম। কাল শুক্রবার । মাইগ্রেনের ব্যথায় ঘর অন্ধকার করে শুয়ে  থাকতে গিয়ে কখন জানি তলিয়ে গেছি। স্নেহা নিশ্চই কিছু খায় নি। টিভিতে যখন থেকে দেখাচ্ছে, জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে হুমায়ূন আহমেদ তখন থেকেই বোবা হয়ে আছে ।

কাঁচঘরে গিয়ে স্নেহাকে পাওয়া গেলো। একপাশে হেলান দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। বাইরে শ্রাবণের মুষল বৃষ্টি। আমার ভেতরটা ধক করে উঠলো । এটা যেন মেঘেদের অন্যরকম কান্না । বৃষ্টি বিলাসী মানুষটা কি শেষমেশ আকাশটাকেও কাঁদিয়ে গেলো?  টিভিতে খবর দেখা দরকার। আমি স্নেহার দিকে তাকালাম হঠাৎ মনে হল, এই মেয়ে কি তিথি? চিত্রা? না কি রূপা? আমি তার কাছে যেতেই ও আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, আমি আর কোনদিন জোছনা  দেখবো না।

আমি জানি এই গোঁয়ার মেয়েটা কি করতে পারে। আমার ভিতর পুষে রাখা হিমু কে আজ আবার বের করতে ইচ্ছা হচ্ছে। একমাত্র হিমুই জানে কেন স্নেহা প্রতি পুন্নিমায় একা বসে কাঁদে । কিভাবে আজ তাকে শান্তনা দিতে হয়। 

No comments:

Post a Comment